কারবালা পর্ব - ০৩
**********
কারবালাতে যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল তার পিছনে কোনো সাধারণ কারণ ছিলো না। উক্ত ঘটনার প্রধান কারণ হলো দ্বীন-ইসলাম কে রক্ষা করা।
ইমাম হোসাইন চেয়েছিলেন রাসূলে খোদা (সাঃ) এর উম্মতগনকে সঠিক পথে পরিচালনা করা, তাদের থেকে অন্যায় পথকে পরিত্যাগ করা এবং সত্য ও ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করা।
কারবালার সেই ঐতিহাসিক ঘটনা কোনো গোষ্ঠী বা মাজহাবকে নিয়ে ঘটেনি। উক্ত ঘটনা পুরো মুসলিম উম্মাহর রক্ষায় ঘটেছিল।
ইমাম হোসাইন কারবালায় যাওয়ার আগে ঘোষণা দেনঃ “আমি আমার নানার দ্বীনকে রক্ষা ও নানার উম্মতকে সংশোধনের উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করছি।” এর দ্বারা ইমাম হোসাইন তাঁর উদ্দেশ্যে সকলের মাঝে তুলে ধরেন।
মহান আল্লাহ, পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন, “তোমাদের মধ্যে এমন এক দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের পথে আহবান করবে এবং ন্যায়সঙ্গত কর্মের আদেশ করবে ও অসঙ্গত কর্মে বাধা দান করবে আর এরাই সফলকাম হবে।” (সূরা আলে ইমরান: ১০৪)
ইমাম হোসাইন মহান আল্লাহর আদেশ রক্ষার্থে কারবালায় আসেন। তিনি আল্লাহর রসুলের (সাঃ) উম্মতগণকে ন্যায় পথের বার্তা দেন এবং অন্যায়কারীদের অন্যায় থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
ইমাম হোসাইন বনি উমাইয়া’র ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, “সাবধান! তারা আল্লাহর আনুগত্যকে ত্যাগ করে শয়তান-এর আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকার করেছে। শরিয়তের বিধি-বিধান উপেক্ষা করে ফিৎনা-ফ্যাসাদ-এর পথ অবলম্বন করছে। তারা নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী বায়তুল মালের অপব্যবহার করছে। মহান আল্লাহ কর্তৃক ঘোষিত হালাল বিষয়গুলিকে হারাম এবং হারাম বিষয়গুলিকে হালাল হিসাবে গণ্য করছে। সুতরাং এ অবস্থার সংশোধনকে আমি অপরিহার্য মনে করি।” (তারিখে তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃ.৩০৭)
ইমাম হোসাইন সকলের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, “তোমরা কি দেখছ না, হক এর উপরে আমল হচ্ছে না এবং বাতিলকে পরিত্যাগ করা হচ্ছে না।”
কারবালাতে ইমাম হোসাইন ইয়াজিদ কতৃক চাপিয়ে দেওয়া অসম-যুদ্ধে লিপ্ত হবার আগে অনেকবার ইয়াজিদ বাহিনীকে সঠিক ইসলাম এর দাওয়াত দিয়েছেন। ন্যায় এর পথে ফিরে আসার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।
ইয়াজিদ ও ইয়াজিদের বাহিনী কি জানত না ইমাম হোসাইন কে ছিলেন ? তাঁর মর্যাদা, তাঁর ফজিলাত কি ছিলো ? তারা কি রাসূল (সাঃ)-এর মুখে ইমাম হোসাইন-এর মর্যাদা শোনে নাই ? (ইয়াজিদ বাহিনীর অনেকেই ছিল কথিত সাহাবী-নামধারী মোনাফিক)
তাঁর ফজিলাত সংম্লিষ্ট শতশত হাদিস হতে কয়েকটি প্রদত্ত হইল:
★
৩৭৫১. বুখারী (তাওহিদ)
ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বাকর (রাঃ) বললেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সন্তুষ্টি তাঁর পরিবারবর্গের (মুল আরবীতে আছে 'আহলে বাইত') প্রতি সদাচরণের মাধ্যমে অর্জন কর।
(আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৪৬৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৪৭৬)
★৩৮৩৯। জামে আত-তিরমিজি (বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার), ৬ষ্ঠ খন্ড।
আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হুঁশিয়ার! আমার আহলে বাইত হল আমার আশ্ৰয়স্থল, যেখানে আমি ফিরে আসি।
[৫৯৮৯-মেশকাত (এমদাদিয়া লাইব্রেরী), ১১ খন্ড; হিদায়াতু রুওয়াত ৫/৪৮৮, তিরমিযী (তাহকিককৃত) ৩৯০৪, মুসনাদে আহমাদ ১১৮৬০, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ ৩২৩৫৭, মুসনাদে আবূ ইয়া'লা ১০২৫।]
★৬০৪৩। মুসলিস (ইঃ ফাঃ বাঃ)
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকালে বের হলেন। তাঁর গায়ে ছিলো কালো পশম দ্বারা খচিত একটি পশমী চাঁদর। হাসান ইবনু আলী (রাঃ) এলেন, তিনি তাঁকে চাঁদরের ভেতর ঢুকিয়ে নিলেন। হুসায়ন ইবনু আলী (রাঃ) এলেন, তিনিও তার সঙ্গে (চাদরে) ঢুকে পড়লেন। ফাতিমা (রাঃ) এলেন, তাকেও ভেতরে ঢুকিয়ে ফেললেন। অতঃপর আলী (রাঃ) এলেন, তাঁকেও ভেতরে ঢুকিয়ে নিলেন। পরে বললেনঃ হে আহলে বাইত! আল্লাহ তাআলা তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে বিদুরিত করে তোমাদের অতিশয় পবিত্রময় করতে চান। (৩৩:৩৩)
★ ৬১৬৩-মিশকাতুল মাসাবিহ (মেশকাত)
আবূ সাঈদ (আল খুদরী) (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: হাসান ও হুসায়ন দু’জনই যুবক জান্নাতীদের নেতা। (তিরমিযী)
[সহীহ: তিরমিযী (তাহকিককৃত) ৩৭৬৮, সিলসিলাতুস সহীহাহ ৭৯৬, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ ৩২১৭৬, ১১০১২, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬৯৬৯, হিলইয়াতুল আওলিয়া ৫/৫৮, আল মু'জামুল কাবীর লিত্ব তবারানী ২৫৩৫, আল মু'জামুল আওসাত্ব ৩৬৬।]
★ ২৮৫৪ - হাদিস সম্ভার
আবূ হুরাইরা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি (হাসান-হুসাইন) এ দুজনকে ভালোবাসল, সে আসলে আমাকে ভালোবাসল। আর যে ব্যক্তি এ দুজনকে ঘৃণা ( মুল আরবীতে আছে গজব; মানে কষ্ট, রুষ্ট, অবজ্ঞা) করল, সে আসলে আমাকে ঘৃণা (গজব- কষ্ট, রুষ্ট, অবজ্ঞা) করল।
(বাইহাক্বী ৬৬৮৫, হাকেম ৪৭৯৯, ত্বাবারানী ২৫৮১, সিঃ সহীহাহ ২৮৯৫)
★ ১৪৩। ইবনে মাজা
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি হাসান ও হুসায়নকে ভালোবাসে, সে আমাকেই ভালোবাসে এবং যে ব্যক্তি তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, সে আমার প্রতিই বিদ্বেষ পোষণ করে।
[আহমাদ ৭৮১৬, ১০৪৯১। তাহক্বীক্ব আলবানী: হাসান। তাখরীজ আলবানী: আহকামুল জানায়িয ১০১।]
★ ৬১৬৯--মিশকাতুল মাসাবিহ (মেশকাত)
ইয়া'লা ইবনু মুররাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: হুসায়ন আমার হতে আর আমি হুসায়ন হতে। যে হুসায়নকে ভালোবাসবে আল্লাহ তা'আলা তাকে ভালোবাসবেন।
[হাসান: তিরমিযী ৩৭৭৫, ইবনু মাজাহ ১৪৪, মুসনাদে আহমাদ ১৭৫৯৭, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ ৩২১৯৬, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬৯৭১, আল মু'জামুল কাবীর লিত্ব তবারানী ২৫২৫, আল আদাবুল মুফরাদ ৩৬৪। মেশকাত।]
★ ১৪৫। ইবনে মাজা
যায়দ ইবনু আরক্বাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী, ফাতিমাহ, হাসান ও হুসায়ন (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেনঃ যারা তোমাদের শান্তি ও স্বস্তিতে রাখবে, আমিও তাদের শান্তিতে রাখবো এবং যারা তোমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করবে, আমিও তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবো।
[তিরমিজি (বা ই সে), ৬ষ্ঠ খন্ড, ৩৮০৭।
তিরমিযী (তাহকিককৃত) ৩৮৭০, তাখরীজ আলবানী: মেশকাত ৬১৪৫।]
রাসূলের (সাঃ) এর ওফাতের পর দ্বীন-ইসলাম ধ্বংসের চক্রান্ত শুরু হয়। ইসলামের মুখোশ পরেই ইসলাম বিরোধী কাজে লিপ্ত হতে থাকে মুসলমান নামধারী কিছু মুনাফিকের দল। ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার শাসনামলে পরিস্থিতির এতটাই অবনতি হতে থাকে যে রাসূল (সাঃ) এর রেখে যাওয়া ইসলামের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু ইমাম হোসাইন তা হতে দেননি তিনি কারবালার মাধ্যমে ইসলামকে আবার উজ্জীবিত করে তোলেন। ইমাম হুসাইন (আঃ) সমগ্র মুসলিম উম্মাহ এর জন্য অনুকরণীয় জীবনাদর্শ।
অথচ ইয়াজিদের মদদপুষ্ট লেবাসধারী-ইসলামের ফতোয়াবাজরা জান্নাতের সর্দার ইমাম হোসাইনকে কাফের ফতোয়া দিয়ে নির্মমভাবে তাঁকে, তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের হত্যা করে!
আজও ইয়াজিদের অনুসারী-ফতোয়াবাজরা ক্ষান্ত হয় নি বরং আরো তেজস্বীরূপে তারা সত্যকে গোপন করে আল্লাহর দ্বীনের ভিত্তিকে অস্বীকার করে ক্রমাগত কুফরি করেই চলেছে।
কোরআনের বাণীঃ
"যারা কুফরি করবে (সত্যকে গোপন করার কাজ অব্যাহত রাখবে) এবং সত্য গোপনকারী অবস্থায় মারা যাবে, তাদের প্রতি আল্লাহর লানত এবং ফেরেশতাকুল ও সমস্ত মানুষের লানত।" (০২, সুরা বাকারা: আয়াত ১৬১)
ইমাম হোসাইনের হত্যার সাখে জড়িত সকল ব্যক্তির উপর ও ইমাম হোসাইনের বিপরীতে এবং ইয়াজিদের পক্ষে সকল যুগের ফতোয়াবাজদের উপর ইমাম হোসাইন-প্রেমিকদের পক্ষ থেকে লানত বর্ষিত হোক!
No comments:
Post a Comment