Thursday, August 4, 2022

কারবালা - ০৪

    কারবালা-৪

**********
মহররম মাস ও আশুরার (১০ই মুহররম) দিনটা মুসলিম জাহানের উপর চেপে বসা রাজা, বাদশাহ, শেখ ও আমির শাসিত রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর জন্যে একটা চরম বিব্রতকর দিন। বংশানুক্রমে এরা ক্ষমতা আঁকড়ে আছে আর এই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা মুয়াবিয়া ও ইয়াজিদের কু-আদর্শের বাস্তবায়ন ও প্রচার করেই যাচ্ছে।
কারবালার অসম-যুদ্ধে ইয়াজিদকে দায়ী হলে, ইমাম হুসাইনের ত্যাগ/ কোরবাণী বৈধতা পায়। মানুষ তখন রাজতন্ত্রকে ঘৃণা করবে এবং রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠবে। কাজেই সেটা যাতে হতে না পারে সে দায়িত্ব পালন করেছেন ইয়াজিদের দরবারী আলেমরা। যাদের মধ্যে শতশত তথাকথিত সাহাবী, তাবেঈ, মসজিদের ইমাম, মুফতি, হাফিজ ছিল।
রাজতন্ত্রের মদদপুষ্ট দরবারী আলেমগণ ধূর্তামীর আশ্রয়ে 'প্রকৃত ইতিহাস' শেখাবার নামে বড়ই চাতুর্য্যপূর্ণভাবে ইয়াজিদের সাফাই গায়। দরবারী আলেমরা বড়ই ধূর্ত। তারা প্রথমেই ইমাম হোসাইন-এর পক্ষে এমনভাবে বন্দনা করেন যে মনে হবে তারা ইমাম হোসাইন-এর খুবই ভক্ত এবং ইমাম হোসাইনের মহব্বতে তাদের কলিজা ভরপুর।
কিন্তু একই সাথে তারা বুঝাতে চান ইয়াজিদ ছিলো শাসক, তার বিরোধিতা করে জান্নাতের সর্দার ইমাম হোসাইন ঠিক কাজ করেননি। ইয়াজিদের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করে ইমাম হোসাইনই অন্যায় কাজ করেছেন। তারা বলতে চান, মুসলিমরা ইয়াজিদের শাসনের উপর ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। ইমাম হুসাইন এসে সেই ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করেছেন (নাউজুবিল্লাহ)। আবার কিছু সুবিধাবাদী আলেম বলেছেন, ইয়াজিদকে ভালও বলা যাবে না, আবার খারাপও বলা যাবে না। কি গোঁজামিল!
এসব ভন্ড/মোনাফিক দিয়ে নানা কল্পকাহিনী ফেঁদে কারবালার ইতিহাস পাল্টে দেয়ার অপচেষ্টা হয়েছিলো এবং এখনো ঠিক সমভাবেই হচ্ছে। ইমাম হেসাইন কেন ইয়াজিদের বিরুদ্ধে গেলেন, মদিনা থেকে কেন বের হলেন, নানাভাবে ইনিয়ে বিনিয়ে ইমাম হোসাইনকে ক্ষমতালোভী আখ্যায়িত করে প্রকারান্তে তাকেই দোষী সাব্যস্ত করার অপচেষ্টাও কম হয়নি।
দরবারী আলেমরা চরম ধূর্ততার আশ্রয়ে ইয়াজিদকে ভাল শাসক, ইসলামের খেদমতগার বলেও প্রতিপন্ন করতে চান। তাদের মতে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো নাকি সহিহ নয়। তারা মানুষকে বোঝাতে চান, ইয়াজিদ ইমাম হোসাইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্দেশ দিলেও ইমাম হোসাইনকে হত্যার নির্দেশ দেয়নি! কিন্তু ইয়াজিদ যখন ইমাম হোসাইনকে তাঁর সঙ্গীসহ নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা শুনলো তখন ইয়াজিদ ব্যথিত হয়েছিল বা হত্যাকারীদের শাস্তি দিয়েছিল এমন কোন দলীল তো পাওয়া যায় না। গর্ভনর ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ এবং কারবালায় তার বাহিনীর সবাইতো স্বপদে বহাল তবিয়তেই ছিল। তাহলে কি প্রতিপন্ন হলো? দরবারীরা আরো বুঝাতে চান, রাজতন্ত্র তেমন খারাপ কিছু নয়।
জান্নাতের সর্দারকে হত্যাকারী জালিম শাসক ইয়াজিদকে নাকি ভাল খারাপ কোনটাই বলা যাবে না। এই না বলার অর্থ তো ইয়াজিদকে সমর্থন করাই।
ইয়াজিদের সমর্থনে কিছু জাল হাদীসও যুগে যুগে মানুষকে গেলানোর অপচেষ্টা হয়েছে।
তার একটা হলো من وسع على عياله يوم
عاشوراء وسع الله عليه سائر السنة. قال الإمام أحمد : لا يصح هذا الحديث
“যে ব্যক্তি আশুরার দিনে তার পরিবারবর্গের লোকদের জন্য সচ্ছলতার (ভাল খাবার) ব্যবস্থা করবে আল্লাহ সারা বছর তাকে সচ্ছল রাখবেন।”
এ হাদীস সম্পর্কে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. বলেছেন; হাদীসটি সহীহ নয়। প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ ইবনে কায়্যিম জাওযী রহ. এ হাদীস সম্পর্কে বলেছেনঃ
رواه الطبراني عن أنس مرفوعا، وفي إسناده الهيصم بن شداخ وهو مجهول، ورواه العقيلي عن أبي هريرة وقال: سليمان بن أبي عبد الله مجهول، والحديث غير محفوظ، وكل طرقه واهية ضعيفة لا تثبت
“তাবারানী হাদীসটি আনাস রা. সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এ সূত্রে হাইছাম ইবনে শাদ্দাখ নামের ব্যক্তি অপরিচিত। এবং উকায়লী বর্ণনা করেছেন আবু হুরাইরা রা. থেকে। এবং তিনি বলেছেনঃ এ সূত্রে সুলাইমান বিন আবি আব্দুল্লাহ নামের ব্যক্তি অপরিচিত। হাদীসটি সংরক্ষিত নয় আর এ হাদীসের প্রত্যেকটি সূত্র একেবারে বাজে ও খুবই দূর্বল।(আল-মানারুল মুনীফ ফিসসহীহ ওয়াজ যয়ীফ : ইবনে কায়্যিম জাওযী -রহ.)
ইয়াজিদ আর রাজতন্ত্রকে বৈধতা দেবার কি প্রাণান্তর অপচেষ্টা! না জানি আরো কত জাল হাদীস তারা সৃষ্টি করে রেখেছে!
মুসলিম ছদ্মবেশে ইয়াজিদের প্রেতাত্মারা আজও আমাদের আশেপাশে। এইসব সত্য অস্বীকারকারী যালিমদের জন্য আছে নিকৃষ্ট জাহান্নাম।
আল্লাহ বলেন:
আমি (সত্য অস্বীকারকারী) যালিমদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছি আগুন, তার বেষ্টনি তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখবে। তারা পানি পান করতে চাইলে তাদের দেওয়া হবে গলিত ধাতুর মতো পানীয়, যা তাদের মুখমন্ডলকে দগ্ধ করে ফেলবে। কী যে নিকৃষ্ট পানীয় আর কতো যে নিকৃষ্ট আশ্রয় তাদের।
[১৮, সুরা কাহাফ: আয়াত ২৯]

No comments:

Post a Comment

ডিপ্রেশন কী?

  ডিপ্রেশন কী? উত্তরঃ তুমি এবং তোমার স্রষ্টার মধ্যকার দুরত্বের নামই হল ডিপ্রেশন। খাদিজা(রা:) খুব ধনী ঘরের মেয়ে ছিলেন। বিলাসিতার মধ্যেই বড় হও...