কারবালা-২
**********
শেরে-খোদা হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুর দ্বিতীয় পুত্র, খাতুনে জান্নাত মা-ফাতিমার কলিজার টুকরা, রাহমাতুল্লিল আলামীন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদরের নাতি, বেহেশতী যুবকদের সরদার, বাতিলের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ও শহীদে কারবালা ইমাম হুসাইন ৪র্থ হিজরীর শাবান মাসের ৫ তারিখ পবিত্র মদীনা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে মরু অঞ্চলে অবস্থিত ঐতিহাসিক 'কারবালা' নামক স্থানে ৬১ হিজরিতে ৭২ জন সঙ্গীসহ নির্মম ভাবে শহীদ হন।
রাসুল (সাঃ)-এর তিরোধানের ৪০ বছর যেতে না যেতে ইয়াজিদের শাসনামলে কোরান ও সুন্নাহর কোন বিধান আর অবশিষ্ট ছিল না। ছিল শুধু লোক দেখানো লেবাসী-ইসলাম। আজও সুবিধাবাদী ইয়াজিদের অনুসারীরা তা বহন করে যাচ্ছে। অবশ্য তখনও হাজার হাজার সাহাবী বেঁচে ছিলেন। কিন্তু কেউ ভয়ে, কেউ চাপে, কেউ নির্জনবাসে, কেউ আবার প্রলোভনে সবই মেনে নিয়েছিলেন।
এই অবস্থা একদিনে তৈরী হয়নি। ধীরে ধীরে ধ্বস নামতে নামতে ইয়াজিদের শাসনামলে চরম আকার ধারণ করে। মাঝখানে কয়েকবছর নবী(সাঃ)-বংশের কান্ডারী হযরত আলী জনগণের দাবীতে খেলাফতে আসীন হয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাঃ)-এর বিধানের দিকে আসার জন্য সকলকে আহ্বান জানিয়ে সংস্কার শুরু করলে অন্যায়ভাবে তাঁর বিরুদ্ধে হযরত আয়েশার নেতৃত্বে উটের যুদ্ধ, আমীর মুয়াবিয়ার নেতৃত্বে সিফ্ফিনের যুদ্ধ সহ নানা প্রকার অসহযোগিতা চাপিয়ে দেওয়া হয়। নানা ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করা হয় এবং তাঁর পুত্র বেহেশতের সর্দার ইমাম হাসানকেও বিষপানে হত্যা করা হয়।
রাসুল(সাঃ)-এর 'হাশিম' বংশের চিরশত্রু
'উমাইয়া' বংশের আমীর মুয়াবিয়া বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেন। ৬৭৬ খ্রীষ্টাব্দে তিনি তার জ্যৈষ্ঠ পুত্র ইয়াজিদকে তার উত্তরাধিকারী মনোনীত করে ইসলামী বিধান-ব্যবস্থার মর্মমুলে চরম কুঠারাঘাত করেন।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে আমীর মুয়াবিয়া-এর পুত্র ইয়াজিদ ছিল নিষ্ঠুর, বিশ্বাসঘাতক, অধার্মিক ও মদ্যপায়ী।
ইয়াজিদের নির্মমতার কথা জেনেও ইমাম হোসাইন-এর সঙ্গীরা যে জেনে-শুনে-বুঝেই ইমামের সাথে যোগ দিয়েছিলেন, তা খুবই স্পষ্ট। ইমামকে ভালোবেসে, তাঁর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস রেখেই তাঁরা ইমামের সাথে থেকে প্রাণপণে সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছেন।
মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ইমামের সঙ্গীরা অবিচল আস্থা ও ইমানের সাথে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছিলেন। চরম সঙ্কটময় পরিস্থিতিতেও তাঁরা ইমামের সাথে কৃত তাঁদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করেননি।
৬১ হিজরীর কারবালার ঘটনা এতোটাই পৈচাশিক ও নির্মমতম ছিল যে এটা যুগে যুগে কঠিন হৃদয়কেও নাড়া দিয়েছে, এখনো দেয় এবং নিঃসন্দেহ তা কেয়ামত পর্যন্ত জালিমদের বিরুদ্ধে ধিক্কার জানাতে ও ইসলামী শক্তির পক্ষে মুমিনদের উদ্বুদ্ধ করার নিয়ামক হিসাবে ভূমিকা পালন করবে।
আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাঃ)-এর বিধান পুনরুজ্জীবিত করার আন্দোলনের কারনে স্বৈরাচারী শাসক ইয়াজিদের সৈন্যদের হাতে ৬১ হিজরীতে মহানবী(সাঃ)-এর দৌহিত্র বেহেস্তবাসীদের সর্দার ইমাম হুসাইন শাহাদাত বরন করেছিলেন। ইসলামি বিধান-ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবনই ছিল ইমাম হোসাইনের সংগ্রামের মূল লক্ষ্য।
আওলাদে রাসুল (সাঃ) ইমাম জাফর সাদেক বলেছেন, “মুসলমানের জন্য প্রতিটি ভূমিই কারবালা আর প্রতিটি দিন হচ্ছে আশুরা।”
কারবালার সেই ভয়াবহ দৃশ্যের কথা একবার মনে করুন! আপনি নিজেই কারবালায় একজন অবরুদ্ধ, ওই সময় আপনার মানসিক অবস্থা চিন্তা করে দেখুন। একমাত্র আল্লাহর স্মরণ ব্যতীত, পৃথিবীর কোন মোহ, লোভ, লালসা, হিংসা, স্বার্থপরতা ইত্যাদি আপনাকে কি গ্রাস করতে পারবে? এমনি অবস্থায় আপনি হবেন ধীর, স্থির, অচঞ্চল, ও অটল। একটি নিঃশ্বাসও তখন আপনি আল্লাহ্র স্মরণ ব্যতীত গ্রহণ করবেন না। এ হচ্ছে কারবালার শিক্ষা।
'হুসাইনের নিহত হওয়ার ঘটনা আসলে ইয়াজিদেরই মৃত্যু, ইসলাম প্রতিটি কারবালার পর পুনরুজ্জীবিত হয়।" মাওলানা মোহাম্মাদ আলী জওহারের এ উক্তি আমাদের জীবনে বার বার ঘুরে আসে কিন্তু তা থেকে আমরা নিজেকে কতটা সমৃদ্ধ করতে পারি সেটাই কারবালার তাৎপর্য।
No comments:
Post a Comment