Saturday, August 6, 2022

কারবালা পর্ব : ০৫ আশুরা-র দিনে রোযা রাখা কার সুন্নাত (বিধান)?

 আশুরা-র দিনে রোযা রাখা কার সুন্নাত (বিধান)?

******************************************
প্রথমেই বুখারী-র দুটি পরস্পর-বিরোধী হাদিসের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক:
★ ১ম হাদিসঃ
আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জাহিলিয়্যাতের যুগে কুরাইশগণ আশুরার সওম পালন করত এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও এ সওম পালন করতেন। যখন তিনি মদীনায় আগমন করেন তখনও এ সওম পালন করেন এবং তা পালনের নির্দেশ দেন। যখন রমযানের সওম ফরজ করা হল তখন আশুরার সওম ছেড়ে দেয়া হলো, যার ইচ্ছা সে পালন করবে আর যার ইচ্ছা পালন করবে না।
[ বুখারী(আধুনিক প্রকাশনী)- ১৮৬১, বুখারী(ইসলামিক ফাউন্ডেশন)- ১৮৭৩, বুখারী (তাওহীদ)-২০০২]
★২য় হাদিসঃ
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন করে দেখতে পেলেন যে, ইয়াহুদীগণ আশুরার দিনে সওম পালন করে। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ কি ব্যাপার? (তোমরা এ দিনে সওম পালন কর কেন?) তারা বলল, এ অতি উত্তম দিন, এ দিনে আল্লাহ তা‘আলা বনী ইসরাঈলকে তাদের শত্রুর কবল হতে নাজাত দান করেন, ফলে এ দিনে মূসা (আঃ) সওম পালন করেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি তোমাদের অপেক্ষা মূসার অধিক নিকটবর্তী, এরপর তিনি এ দিনে সওম পালন করেন এবং সওম পালনের নির্দেশ দেন।
[বুখারী (আধুনিক প্রকাশনী)- ১৮৬৩, বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)- ১৮৭৫, বুখারী (তাওহীদ)-২০০৪]
হাদিস দু'টির পর্যালোচনা:
***********************
১ম হাদিসটির বর্ণনায় দেখা যায়, আশুরার রোযা ছিলো জাহিলিয়্যাতের যুগে মক্কার কুরাইশগণের সুন্নাত। রাসুল (সাঃ) তা বজায় রাখলেন এবং মদীনায় গিয়েও চালু রাখলেন। অর্থাৎ মক্কা থাককালীনই তিনি এটা জানতেন।
কিন্তু ২য় হাদিসটির বর্ণনায় দেখা যায়,
আশুরা রোযা ছিলো মদীনার ইয়াহুদিদের সুন্নাত। রাসুল (সাঃ) সেটা প্রথম জানেন মদীনাতে এসে ইয়াহুদিদের নিকট থেকে। (ইতোপূর্বে তিনি জানতেনই না?) তখন তিনি আশুরার রোযার নির্দেশ দিলেন।
কোরআন মতে, "রাসুল (সাঃ) মনগড়া কোনো কথা বলেন না, যা বলেন তা ওহি।" (৫৩, সুরা নাজম: আয়াত ৩/৪)। প্রসিদ্ধ হদিস (অসংখ্য রেফারেন্স আছে) মতে রাসুল (সাঃ) যা বলেন নি তা তাঁর নামে বলাটাই জাহান্নামী হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ।
অথচ সেই রাসুল (সাঃ)-এর জবানীতে দু'ধরনের বক্তব্য! এর দায় কে নেবে?
এবার আশুরার রোযা বিষয়ে বুখারীর তৃতীয় হাদিস:
*************
ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরার দিন সিয়াম পালন করেছেন এবং এ সিয়ামের জন্য আদেশও করেছেন। পরে যখন রমাযানের সিয়াম ফরজ হল তখন তা ছেড়ে দেওয়া হয়। ‘
[বুখারী (আধুনিক প্রকাশনী)- ১৭৫৭,
বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)-১৭৬৮,
বুখারী (তাওহীদ)- ১৮৯২]
পর্যালোচনা:
***********
রমযানে রোযা-র বিধান আসার পর আশুরার রোযা-র কোনো বিধান আর থাকলো না। অর্থাৎ জাহিলিয়্যাতের যুগে মক্কার কুরাইশগণের সুন্নাত বা মদীনার ইয়াহুদিদের সুন্নাত হিসাবে প্রচলিত আশুরার রোযা-র বিধান রহিত হলো।
এবার বুখারীর ৪র্থ হাদিস
***********************
হুমাইদ ইবনু আবদুর রাহমান (রহ.) হতে বর্ণিত। যে বছর মু‘আবিয়া (রাঃ) হাজ্জ করেন সে বছর আশুরার দিনে (মসজিদে নাববীর) মিম্বরে তিনি (রাবী) তাঁকে বলতে শুনেছেন যে, হে মদীনাবাসিগণ! তোমাদের ‘আলিমগণ কোথায়? আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি যে, আজকে আশুরার দিন, আল্লাহ তা‘আলা এর সওম তোমাদের উপর ফরজ করেননি বটে, তবে আমি (আজ) সওম পালন করছি। যার ইচ্ছা সে সওম পালন করুক, যার ইচ্ছা সে পালন না করুক।
[বুখারী (আধুনিক প্রকাশনী)-১৮৬২, বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)-১৮৭৪, বুখারী (তাওহীদ)- ২০০৩]
পর্যালোচনা:
***********
হাদিসের ভাষা থেকে বুঝা যায়, তৎকালীন মদীনার আলেমগণের সাথে আমীর মুয়াবিয়া একমত নন। তিনি একাই আশুরার রোযা বিষয়ে বলছেন। রমযানের রোযা-র বিধান আসলে আশুরার রোযা-র বিধান রহিত হয়। আর সেটা মক্কা বিজয়ের পূর্বে (২য় হিজরিতে)। আর মুয়াবিয়া ইসলাম গ্রহন করেন রাসুল (সাঃ) কতৃক সাধারণ ক্ষমার আওতায়, মক্কা বিজয়ের সময় (৮ম হিজরির শেষের দিকে)। অতএব তার পক্ষে মক্কা বিজয়ের পূর্বের সব কথা জানাটা সম্ভব নয়।
সুতরাং দেখা যায় মদীনার আলেমগণের বিপরীতে রহিত হওয়া আশুরা-র রোযা-র বিষয়ে একমাত্র আগ্রহী হলেন ইয়াজিদের পিতা মুয়াবিয়া।
একদল মুসলিম বলে দাবীদার, যারা আশুরার দিনে ইমাম হুসাইনের শহীদ হওয়ার কারণে আনন্দ , ফুর্তি করে এবং আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য রোজা রাখে । তারা কারা?
************************
★ শারিফে রাযি আশুরা সম্পর্কে বলেন - ইরাকে ইমাম হুসাইনের শাহাদতকে কেন্দ্র করে শোক পালন করা হইত । কিন্ত উক্ত দিনে শামে (সিরিয়া- যেখানে মুয়াবিয়া-র রাজধানী ছিলো) বণি উমাইয়াগণ (মুয়াবিয়া /ইয়াজিদের বংশের নাম) ঈদ উৎযাপন করত । মাক্বরিযি বলেন , মিশরে ফাতেমি হুকুমতকালে আশুরার দিনে ইমাম হুসাইনের শাহাদতকে কেন্দ্র করে শোক পালন করা হইত । কিন্ত যখন বণি আইয়ুব ক্ষমতায় আসে তখন তারা উক্ত দিনে গোসল করত , চোখে সুরমা লাগাতো , আমোদ ফুর্তি করত আর এভাবে তারা শামের (সিরিয়া) অধিবাসীদের অনুসরণ করত ।
[সূত্র - আলামুন নোবালা , খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৪৩।]
★ সেকাফ বলেন যে , তারা এই জাতীয় আমোদ ফুর্তি ইত্যাদি কাজগুলোর মাধ্যমে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেয়ার চেষ্টা করত । কিন্ত তাদের সকল চেষ্টার পরেও কারবালার সম্মান অক্ষুন্ন আছে ।
[সূত্র - সওমে আশুরা বাইনাল সুন্নাতুন নাবী ওয়া বিদআতুল উমাভিয়া , পৃষ্ঠা ১৩৯।]
★ হাজ্জাজ বিন ইউসুফ যখন ক্ষমতায় আসে তখন সে বলে যে , আমি যদি কারবালাতে থাকতাম তাহলে আমিও (ইয়াজিদের পক্ষে) কারবালার শহীদদের রক্ত ঝরাতে পারতাম।
[সূত্র - ইসতেবসার , খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৩৫।]
অতএব কারবালার দিনে (আশুরার দিনে) ঈদ উৎযাপন করা , সুরমা লাগানো , নিজেকে সাজানো , আনন্দমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল বণি উমাইয়ার বিদআতি কাজ সমূহের মধ্যে অন্যতম । মুসলিম বলে দাবীদার আজও মুয়াবিয়া /ইয়াজিদের অনুসারীগণ বণি উমাইয়ার উক্ত কু-আদর্শকে জীবিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে ।
আশুরার রোযা বিষয়ে আওলাদে রাসুল (সাঃ)গণের অভিমত, যাঁদের উপর যথাযথ সম্মানের সাথে দরূদ ও সালাম পাঠ না করলে আল্লাহর দরবারে কোনো বান্দার ইবাদতই কবুল হয় না।
********************
★ জাফর বিন ঈসা নামক এক ব্যক্তি আওলাদে রাসুল (সাঃ) ইমাম রেযাকে (আঃ) আশুরার দিনে রোযা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন ।
ইমাম (আঃ) বলেন যে , তুমি কি আমাকে ইবনে মারজানা-এর (ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ) রোজা সম্পর্কে প্রশ্ন করছো? ইবনে যিয়াদের বংশধরগণ ইমাম হুসাইনকে হত্যা করার খুশীতে আশুরার দিন রোজা রাখে । উক্ত দিনটি রাসুলের (সাঃ) বংশধরগণ এবং তাঁর আহলে বাইতগনের জন্য একটি ভয়াবহ নির্মম , অশুভ ও শোকের দিন । আর অশুভ দিনে রোজা রাখা জায়েজ বা শুভ না ।
★ আওলাদে রাসুল (সাঃ) ইমাম সাদিককে আশুরার দিনে রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন যে , আশুরার দিনে যে ব্যক্তি রোজা রাখবে তার ভাগ্য হবে ইবনে যিয়াদের ভাগ্যের ন্যায়।
ইমামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কি ধরণের ভাগ্য ?
ইমাম বললেন , শুধু আগুন ।
[সূত্র - ইসতেবসার , খন্ড ২ , পৃষ্ঠা ১৩৫ ।]
অন্য বর্ণনায়, "মিসবাহুল মুতাহাজ্জিদ"-এ আব্দুল্লাহ বিন সিনান বর্ণনা করছেন যে,
আমি আওলাদে রাসুল (সাঃ) ইমাম জাফর আস-সাদিক-এর কাছে হাজির হলাম, আর সেদিন ছিলো ১০ মুহাররম। আমি দেখলাম তাঁর চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে এবং তাতে তাঁর শোকের চিহ্ন স্পষ্ট।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে ইমাম, এদিনে রোযা রাখা সম্পর্কে কিছু বলুন।
ইমাম জবাব দিলেন, "অনাহারে থাকো এদিনে, কোনো নিয়ত ছাড়া এবং তা শেষ করো আনন্দ ছাড়া এবং পুরোপুরি অনাহারে থেকো না। এরপর অনাহার ভাঙো আসরের এক ঘন্টা পর (সূর্য অস্ত যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে) কোনো পানীয় পান করে। কারণ এটি ঠিক ঐ সময়, যখন রাসুল (সাঃ)-এর সন্তানের (ইমাম হোসাইন) উপর যুদ্ধ শেষ হয়েছিলো এবং তাঁদের শাহাদাত শেষ হয়েছিলো। আর রাসুল (সাঃ)-এর পরিবারের ত্রিশজন সদস্য মাটিতে পড়েছিলেন (শহীদ হয়ে) তাদের একদল সাথীদের মাঝখানে। আর তাদের শাহাদাত ছিলো রাসুল (সাঃ)-এর জন্য কষ্টকর এবং তিনি যদি সেদিন বেঁচে থাকতেন তাহলে তাঁদের বিষয়ে তাঁর পক্ষ থেকে সমবেদনা জানানো হতো।"

Like
Comment
Share

No comments:

Post a Comment

ডিপ্রেশন কী?

  ডিপ্রেশন কী? উত্তরঃ তুমি এবং তোমার স্রষ্টার মধ্যকার দুরত্বের নামই হল ডিপ্রেশন। খাদিজা(রা:) খুব ধনী ঘরের মেয়ে ছিলেন। বিলাসিতার মধ্যেই বড় হও...