কারবালা ও শোক
****************
প্রকৃত মুমিন সব সময়ই আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাঃ) এর বিধান সমুন্নত চায়। অতএব প্রকৃত মুমিন মানেই তিনি হোসাইনী। আর হোসাইনী মানেই প্রকৃত মুমিন।
আপনজন মারা গেলে মানুষ কাঁদবে, শোক প্রকাশ করবে। এটাই মানব ধর্ম। আর ইসলাম সর্বোৎকৃষ্ট মানবধর্ম। সবচেয়ে আপনজনের ক্ষেত্রে এই কান্না ও শোক আরো বেশী হবে, এটাই স্বাভাবিক। যারা এর বিরোধিতা করবে তারা হয় অমানুষ, নয় অসুস্থ।
মুমিন হতে হলে নিজের জীবনসহ সবকিছু থেকে রাসুলই (সাঃ) হবেন সবচেয়ে প্রিয় ও আপন।
★ ৬৭। ইবনে মাজা
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি তোমাদের কারো কাছে তার সন্তান-সন্ততি, তার পিতা-মাতা ও সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় না হওয়া পর্যন্ত সে (পূর্ণ) মুমিন হতে পারবে না।
[বুখারী ১৫, মুসলিম, নাসায়ী ৫০১৩-১৪, আহমাদ ১২৭৩৯, ১৩৪৯৯, ১৩৫৪৭; দারিমী ২৭৪১। তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ। তাখরীজ আলবানী:]
সেই রাসুল (সাঃ) আবার বলিয়াছেনঃ
★ "যে ব্যক্তি হাসান ও হোসাইনকে ভালোবাসে, সে আমাকেই ভালোবাসে এবং যে ব্যক্তি তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, সে আমার প্রতিই বিদ্বেষ পোষণ করে।"
[আহমাদ ৭৮১৬, ১০৪৯১। তাহক্বীক্ব আলবানী: হাসান। তাখরীজ আলবানী: আহকামুল জানায়িয ১০১, ইবনে মাজা ১৪৩।]
★ "হোসাইন আমার হতে আর আমি হোসাইন হতে। যে হোসাইনকে ভালোবাসবে আল্লাহ তা'আলা তাকে ভালোবাসবেন।"
[হাসান: তিরমিযী , ইবনু মাজাহ ১৪৪, মুসনাদে আহমাদ ১৭৫৯৭, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ ৩২১৯৬, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬৯৭১, আল মু'জামুল কাবীর লিত্ব তবারানী ২৫২৫, আল আদাবুল মুফরাদ ৩৬৪। মেশকাত।]
"হোসাইনকে ভালোবাসা মানেই রাসুল (সাঃ)-কে ভালোবাসা"। অর্থাৎ রাসুল সাঃ এর মতোই ইমাম হোসাইন যতক্ষণ কোনো ব্যক্তির কাছে তার সন্তান-সন্ততি, পিতা-মাতা ও সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত সেই ব্যক্তি (পূর্ণ) মুমিন হতে পারবেন না।
আবার
"হোসাইন আমার হতে আর আমি হোসাইন হতে।" অর্থাৎ ইমাম হোসাইন রাসুল (সাঃ) থেকে বিচ্ছিন্ন নন।
তাই হোসাইনের জন্য শোক কান্না, রাসুল (সাঃ)-কেই ভালোবাসার নামান্তর।
ইমাম হোসাইন রাসুল (সাঃ)-এর আহলে বাইত (তাঁর ঘরের, অতিনিকটাত্মীয়)।
আর আল্লাহ পবিত্র কোরানে আহলে বাইতের ভালোবাসাকে ফরয করেছেন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেনঃ
قُلۡ لَّاۤ اَسۡـَٔلُکُمۡ عَلَیۡهِ اَجۡرًا اِلَّا الۡمَوَدَّۃَ فِی الۡقُرۡبٰ
বলুন (হে নবী!), এ কাজের (রিসালাতের) জন্য (প্রতিদান স্বরূপ) আমার কুরবা-র (অতিনিকটাত্মীয়গণের) প্রতি মায়াদ্দাত (আনুগত্যপূর্ণ ভালবাসা) ছাড়া তোমাদের কাছে (আর) কিছুই চাই না।
[৪২, সূরা শুরা: আয়াত ২৩]
হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস বর্ণনা করেছেন, যে ,যখন এই আয়াত নাজিল হলো, তখন সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা:) কারা আপনার নিকট আত্মীয়? যাদের আনুগত্যপূর্ণ ভালোবাসা পবিত্র কুরআনে উম্মতের ওপর ফরয করা হয়েছে। উত্তরে নবী (সা:)বললেন, আলী, ফাতেমা, হাসান ও হোসাইন-এর মায়াদ্দাত।
[সূত্র: ১) তাফসীরে মাযহারী খন্ড ১১,পৃষ্ঠা ৬৩ (ই ফা বা); ২)তাফসীরে নূরুল কোরআন (মাওলানা আমিনুল ইসলাম) খন্ড ২৫ ,পৃষ্ঠা ৬৭; ৩) তাফসীরে দুররে মানসুর খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৭, তাফসীরে কাবীর খন্ড ২৭, পৃষ্ঠা ১৬৬(মিশর), ৪) তাফসীরে ইবনে কাসীর খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১১২ (মিশর), ৫)মুসনাদে হাম্বাল খন্ড ১ম, পৃষ্ঠা ২২৯, ৬)তাফসীরে জামে আল বায়ান(তাবারী), ৭)তাফসীরে কুরতুবী খন্ড ১৬ পৃষ্ঠা ২২,(মিশর)]
কোরআন আহলে বায়েতের সাথে কেবল কোন আবেগী সম্পর্ক উপস্থাপন করেনি বরং গুরুত্ব আরোপ করেছে আনুগত্যপূর্ণ ভালবাসার প্রতি। আহলে বায়াতের প্রতি মুসলমানদের সত্যিকারের ভালোবাসার অভিব্যক্তির সবচেয়ে উত্তম বহিঃপ্রকাশ হল তাঁদের প্রদর্শিত অনুকরণীয় চারিত্রিক মডেল অনুসরণ করা। দৈনন্দিন জীবনে তাঁদের শিক্ষা ও নির্দেশনা মেনে চলা।
হযরত আবুবকরও সে কথাটি বলেছেন: মহানবী (সা:)-এর সন্তুষ্টি তাঁর আহলে বাইতের আনুগত্যপূ্র্ণ ভালোবাসার মধ্যে নিহিত।
[বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪৪৭ , ৩৪৭৯, (ই ফা বা,)]
আহলে বাইতের প্রতি আনুগত্যপূর্ণ ভালোবাসা হলো কোরআন অনুযায়ী রাসুলের (সাঃ) সমগ্র রেসালাতের বিনিময় স্বরুপ। ঈমান, নামায,রোযা হজ্ব যাকাত, কুরবানীসহ রাসুল (সাঃ) আমাদের জন্য যা যা এনেছেন, যা যা করেছেন, সবই রেসালাতের অংশ।
অতএব রাসুল (সাঃ)-এর রেসালাত থেকে কোন কিছু গ্রহন করতে হলে প্রতিদান স্বরূপ সবার আগে চাই আহলে বাইতের মায়াদ্দত (আনুগত্যপূর্ণ ভালোবাসা)।
সুতরাং আহলে বাইতের মায়াদ্দত ব্যতিত ঈমান, নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত, কুরবানী
টোটালই অর্থহীন, অসার।
বিধায় হযরত আলী, মা ফাতেমা, ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইনের প্রতি যারা বিদ্বেষ রাখে, শত্রুতা করে অথবা তাঁদের বিষয়ে নিষ্ক্রিয় থাকে; তারা কোরআনকে অমান্য করে, আল্লাহ ও রাসুল (সাঃ)-এর বিধানকে অমান্য করে, তারা কোনো মতেই মুমিন হতে পারে না।
ইয়াজিদ ও তার দলবল কারবালার ঘটনার সময় বেঁচে থাকা নবী(সাঃ)-পরিবারের সম্মানিতা মহিলা ও শিশুদেরকে তাঁদের ৭২ জন প্রিয় মানুষকে হারানোর শোকে কাঁদতে পর্যন্ত দেয় নি। কি নির্মমতা!
আজও মুয়াবিয়া ও ইয়াজিদের রাজতান্ত্রিক আদর্শের দেশসমুহ ও তাদের মদদপুষ্ট ফতোয়াবাজরা ইমাম হোসাইনের জন্য শোক করা যাবে না, মর্মে মনগড়া ফতোয়া দিয়েই যাচ্ছে।
কিন্তু প্রকৃত মুমিনগণ তাঁদের কাজ করেই যাবে। কেয়ামত পর্যন্ত তা চলতেই থাকবে। যতই ইয়াজিদের প্রেতাত্মারা তা অপছন্দ করুক। ইতোপূর্বে জান্নাতের সর্দার ইমাম হোসাইনকে তো তারা কাফের ফতোয়া দিয়েইছিলো! কি চরম মুর্খতা!
কান্না ও শোকের দলিল কোরআনে আছে। বিধায় আল্লাহ পাক আপনজনের জন্য শোক ও কান্না পছন্দ করেন।
হযরত ইয়াকুব নবী (আঃ) পুত্র হযরত ইউসুফ নবীকে হারিয়ে বছরের পর বছর ধরে বুক চাপড়িয়ে কেঁদেছিলেন। সেই কান্নার বিলাপ আকাশ-পাতাল ভূকম্পিত হতো। কাঁদতে কাঁদতে দুই চোখের জ্যোতি হারিয়ে ফেলেছিলেন। চোখ সাদা হয়ে গিয়েছিলো। অবশেষে হযরত ইউসুফ নবীকে পেয়ে মহা আনন্দ উপভোগ করেছিলেন। আপনজনের বিয়োগ/বিচ্ছেদ সবসময় শোকময়ই হয়ে থাকে।
নবী ইয়াকুব (আঃ) কান্না ও শোক বিষয়ে কোরআনের দলিলঃ ১২ নম্বর সুরা ইউসুফের ৮৪/৮৫/৮৬ আয়াত।
************************************
★ তিনি (ইয়াকুব নবী) তাদের (তাঁর ছেলেদের) সাথে কথা না বাড়িয়ে আত্মমগ্ন হন এবং স্বগতোক্তি করেন: "ইউসুফের জন্য আমি শোকাভিভূত।" এভাবে দুঃখ ও শোকে তাঁর চক্ষুদ্বয় সাদা হয়ে যায়। আর মনোবেদনায় তিনি পীড়িত হয়ে পড়েন।
(১২, সুরা ইউসুফ: আয়াত ৮৪)
★ তারা (ছেলেরা) বললো: আল্লাহর কসম, মুমূর্ষু হয়ে পড়া, কিম্বা মৃত্যুবরণ করা পর্যন্ত (মনে হয়) আপনি ইউসুফের স্মরণ থেকে বিরত হবেন না।
(১২, সুরা ইউসুফ: আয়াত ৮৫)
★ তিনি (ইয়াকুব) বললেন: আমি আমার দুঃখ-বেদনা ও মনস্তাপের অভিযোগ তো শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে নিবেদন করছি। আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তা জানি, যা তোমরা জানো না।
(১২, সুরা ইউসুফ: আয়াত ৮৬)
পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট দলিল থাকার পরও কোরআন-বিরোধী ইয়াজিদের অনুসারীরা নবী ইউসুফের (আঃ) ভাইদের মতো, যতই ফতোয়া দিক তা অন্তঃসারশূন্য, নিস্ফল।
ইউসুফ নবী (আঃ) তখনও তো মারা যান নি, এটা ইয়াকুব নবী (আঃ) জানতেন, তবু কি শোক! আর ইমাম হোসাইন তো শ্রেষ্ঠ নবী (সাঃ)-এর দ্বীন রক্ষার জন্য সপরিবারে শহীদ হয়েছেন, এক্ষেত্রে মুমিনদের জন্য শোকের মাত্রা আরো তীব্র হবে, এটাই স্বাভাবিক।
প্রকৃত মুমিনগণ নবী ইয়াকুবের(আঃ) মতো শত বাধা সত্বেও ইমাম হোসাইনের জন্য সবসময়ই শোকাভিভূত থাকবে।
★ এবার হাদিসে চোখ দেওয়া যাক:
*******************************
পবিত্র কোরআনের ৩৩ নম্বর সুরা আহযাবের ৩৩ নম্বর আয়াত অনুযায়ী রাসুল (সাঃ) এর আহলে বাইত পূতপবিত্র, সকল ভুলের উর্ধ্বে।
সাহাবীগণ আহলে বাইতের মতো পূতপবিত্র নন। তাদের ভুল হয়, হওয়াটা স্বাভাবিক। হাদিস বর্ণনা তার ব্যতিক্রম নয়। অনেকের মতো হাদিস বর্ণনায় ভুল হযরত উমারের হয়েছিলো। তার ছেলে হযরত ইবনে উমারেরও হয়েছিলো।
ভুলভাবে হোক বা ভুল করেই হোক; "মৃত ব্যক্তিকে তার স্বজনদের কান্নাকাটির দরুন আযাব দেয়া হয়"- মর্মে রাসুল (সাঃ)-এর বরাত দিয়ে তারা জোরালো ভাবে হাদিস বর্ণনা করেন। হযরত উমারের মৃত্যু পর্যন্ত তা চলেছিলো এবং হযরত উমারের শাসনামলে স্বজনদের মৃত্যুতে তাই কেউ কাঁদতে পারতো না। জোর করে মনটাকে দমন করতে হতো।
হযরত উমারের মৃত্যুর পর সাহাবী হযরত ইবনে আব্বাস বিষয়টি হযরত আয়েশার দৃষ্টিতে আনলে, হযরত আয়েশা বলেন, "তোমরা আমাকে এমন দু' ব্যক্তির কথা শুনাচ্ছ, যারা মিথ্যাবাদী নন আর তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্নও করা যায় না। তবে কখনও শুনতে ভুল হয়ে যেতে পারে।"
শোক করার বিপক্ষে
অর্থাৎ "মৃত ব্যক্তিকে তার স্বজনদের কান্নাকাটির দরুন আযাব দেয়া হয়"
মর্মে হযরত উমার ও তার পুত্র হযরত ইবনে উমার কর্তৃক রাসুল (সাঃ)-এর বরাত দিয়ে বর্ণিত ভুল হাদিস, হযরত উমারের মৃত্যুর পর হযরত আয়েশা কর্তৃক সংশোধন-সংশ্লিষ্ট হাদিসসমুহ:
*****************
★ ১২৯০. বুখারী (তাওহীদ)
আবূ বুরদাহর পিতা (আবূ মূসা আশ‘আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন উমার (রাঃ) আহত হলেন, তখন সুহাইব (রাঃ) হায়! আমার ভাই! বলতে লাগলেন। ‘উমার (রাঃ) বললেন, তুমি কি অবহিত নও যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জীবিতদের কান্নার কারণে অবশ্যই মৃতদের আযাব দেয়া হয়?
[বুখারী(আধুনিক প্রকাশনী) ১২০৪, বুখারী(ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ১২১৩।]
★
২০৪১-মুসলিম (হাঃ একাডেমি)
হারমালাহ ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) ..... আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মৃত ব্যক্তিকে তার বংশধরের কান্নাকাটির দরুন আযাব দেয়া হয়।
[মুসলিম(ইসলামী ফাউন্ডেশন) ২০২০, মুসলিম(ইসলামীক সেন্টার) ২০২৭।]
★ ১২৮৯. বুখারী (তাওহীদ)
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণী আয়িশা (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ইয়াহুদী স্ত্রীলোকের (কবরের) পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, যার পরিবারের লোকেরা তার জন্য ক্রন্দন করছিল। তখন তিনি বললেন: তারা তো তার জন্য ক্রন্দন করছে। অথচ তাকে কবরে আযাব দেয়া হচ্ছে।
[বুখারী(আধুনিক প্রকাশনী) ১২০৫, বুখারী(ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ১২১২।]
★
২০৪২-মুসলিম (হাঃ একাডেমি)
খালাফ ইবনু হিশাম ও আবুর রাবী' আয যাহরানী (রহঃ) ..... উরওয়াহ ইবনু যুবায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আয়িশা (রাযিঃ) এর কাছে ইবনু উমারের বক্তব্য "মৃত ব্যক্তিকে তার স্বজনদের কান্নাকাটির দরুন আযাব দেয়া হয়" উল্লেখ করা হল। তিনি বললেন, আল্লাহ আবূ আবদুর রহমানের (ইবনু উমর) প্রতি রহমত করুন। তিনি একটা কথা শুনেছেন, তবে স্মরণ রাখতে পারেননি।
প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছেঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে দিয়ে এক ইয়াহুদীর জানাযাহ যাচ্ছিল। তখন তার আত্মীয় স্বজনরা কাঁদছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কাঁদছ? অথচ তাকে এজন্য আযাব দেয়া হচ্ছে।
[মুসলিম(ইসলামী ফাউন্ডেশন) ২০২১, মুসলিম(ইসলামীক সেন্টার) ২০২৮।]
★১২৮৮. বুখারী (তাওহীদ)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, উমার (রাঃ)-এর মৃত্যুর পর আয়িশা (রাযি.)-এর নিকট আমি উমার (রাঃ)-এর এ উক্তি উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, আল্লাহ্ উমার (রাঃ)-কে রহম করুন। আল্লাহ্র কসম! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বলেননি যে, আল্লাহ্ ঈমানদার (মৃত) ব্যক্তিকে তার পরিজনের কান্নার কারণে আযাব দিবেন।
অতঃপর আয়িশা (রাযি.) বললেন, (এ ব্যাপারে) আল্লাহ্র কুরআনই তোমাদের জন্য যথেষ্ট। (ইরশাদ হয়েছে): ‘বোঝা বহনকারী কোন ব্যক্তি অপরের বোঝা বহন করবে না’- (আন‘আম ১৬৪)। তখন ইবনু আব্বাস (রাঃ) বললেন, আল্লাহ্ই (বান্দাকে) হাসান এবং কাঁদান।
রাবী ইবনু আবূ মুলাইকাহ (রহ.) বলেন, আল্লাহ্র কসম! (এ কথা শুনে) ইবনু উমার (রাঃ) কোন মন্তব্য করলেন না।
[বুখারী (আধুনিক প্রকাশনী) ১২০৩ শেষাংশ, বুখারী(ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ১২১১ শেষাংশ]
★২০৩৬- মুসলিম (হাঃ একাডেমি)
আইয়ূব (রহঃ) বলেন, ইবনু আবূ মুলায়কাহ বলেছেন, আমাকে কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ জানিয়েছেন,
তিনি বলেন, আয়িশা (রাযিঃ) এর নিকট যখন উমর (রাযিঃ) ও ইবনু উমার-এ বক্তব্য পৌছল তখন তিনি বললেন, তোমরা আমাকে এমন দু'ব্যক্তির কথা শুনাচ্ছ, যারা মিথ্যাবাদী নন আর তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্নও করা যায় না। তবে কখনও শুনতে ভুল হয়ে যেতে পারে।
[মুসলিম(ইসলামী ফাউন্ডেশন) ২০১৭, মুসলিম(ইসলামীক সেন্টার) ২০২৪]
★ ২০৪৩-মুসলিম (হাঃ একাডেমি)
আবূ কুরায়ব (রহঃ) ..... হিশাম তার পিতা [উরওয়াহ ইবনু যুবায়র (রহঃ)] থেকে বর্ণিত।
তিনি বলেন, আয়িশা (রাযিঃ)-এর নিকট উল্লেখ করা হল, ইবনু উমর (রাযিঃ) সরাসরি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেন, "মৃত ব্যক্তিকে তার কবরে তার স্বজনদের কান্নাকাটির দরুন শাস্তি দেয়া হয়।" তিনি বললেন, ইবনু উমার (রাযিঃ) ভুলে গেছেন।
[মুসলিম(ইসলামী ফাউন্ডেশন) ২০২২, মুসলিম(ইসলামীক সেন্টার) ২০২৯।]
★ ২০৪৫-মুসলিম (হাঃ একাডেমি)
কুতায়বাহ ইবনু সাঈদ (রহঃ) ... আমরাহ বিনতু আবদুর রহমান (রহঃ) থেকে বর্ণিত। আয়িশা (রাযিঃ) এর কাছে শুনেছেন যখন তার কাছে উল্লেখ করা হল যে, আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিঃ) বলছেন, মৃত ব্যক্তিকে তার বংশধরদের কান্নাকাটির দরুন শাস্তি দেয়া হয়।
আয়িশা (রাযিঃ) বললেন, আল্লাহ আবূ আবদুর রহমানকে (ইবনু উমার) ক্ষমা করুন, কথাটা ঠিক নয়। তবে তিনি মিথ্যা বলেননি। বরং তিনি (প্রকৃত কথাটা) ভুলে গেছেন অথবা ভুল বুঝেছেন।
প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছেঃ একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ইয়াহুদী নারীর কবরের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলেন তার জন্য কান্নাকাটি করা হচ্ছে। তিনি বললেন, তারা এর জন্য কান্নাকাটি করছে আর এ নারীকে তার কবরে শাস্তি দেয়া হচ্ছে।
[মুসলিম(ইসলামী ফাউন্ডেশন) ২০২৪, মুসলিম(ইসলামীক সেন্টার) ২০৩১।]
শোক ও কান্না সংক্রান্ত হাদিস
**************************
★
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ঘুমন্ত লোক যেভাবে কিছু দেখে, সেভাবে আমি নবী (সা.) -কে দ্বিপ্রহরে স্বপ্নে দেখলাম। তখন তিনি (সা.) ছিলেন এলোমেলো ও চেহারায় ধূলি মাখা অবস্থায় তার হাতের মাঝে রক্তে পরিপূর্ণ একটি শিশি। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতামাতা আপনার প্রতি কুরবান হোন। এটা কি? তিনি বললেন, এটা হুসায়ন এবং তার সাথিদের রক্ত, যা আমি আজকের দিন অত্র শিশিতে উঠিয়ে রাখছি। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, স্বপ্নের সে সময়টি আমি স্মরণে রাখি। পরে দেখতে পেলাম, হুসায়ন ঠিক সে সময়েই নিহত হয়েছেন।
(সনদ সহীহ: মুসনাদে আহমাদ ২৫৫৩, বায়হাকী ৬/৪৭১, মুসনাদে আবদ ইবনু হুমায়দ ৭১০, আল মু'জামুল কাবীর লিত্ব তবারানী ১২৬৬৬, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম ৮২০১। মেশকাত (এমদাদিয়া) ৫৯২১।)
★
উম্মুল ফাযল বিনতু আল হারিস (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর কাছে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আজ রাত্রে আমি মন্দ একটি স্বপ্ন দেখেছি। তিনি (সা.) বললেন, সে স্বপ্নটা কি? উম্মুল ফাযল (রাঃ) বললেন, তা অতি ভয়ানক। তিনি (সা.) আবার বললেন, আরে বল না, সে স্বপ্নটা কি? তখন উম্মুল ফাযল (রাঃ) বললেন, আমি দেখেছি, আপনার দেহ হতে যেন এক টুকরা গোশত কর্তন করা হয়েছে এবং তা আমার কোলে রাখা হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তুমি খুব উত্তম ও চমৎকার স্বপ্ন দেখেছ। ইনশা-আল্ল-হ কন্যা ফাতিমা একটি ছেলে সন্তান প্রসব করবে, যা তোমার কোলেই রাখা হবে। অতএব কিছু দিন পর ফাতিমার গর্ভে হুসায়ন জন্মগ্রহণ করলেন এবং তাঁকে আমার কোলেই রাখা হলো, যেমনটি রাসূলুল্লাহ (সা.) ও বলেছিলেন।
[উম্মুল ফাযল (রাঃ) বলেন,] এরপর একদিন আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর কাছে গেলাম এবং বাচ্চাটিকে (শিশু হুসায়নকে) তার কোলে রাখলাম। অতঃপর আমি (অন্যমনস্কে) আরেক দিকে দেখছিলাম। সহসা এদিকে ফিরে তাকাতেই দেখলাম, রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর চক্ষুদ্বয় হতে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে। উম্মুল ফাযল (রাঃ) বলেন, তখন আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর নবী! আপনার প্রতি আমার পিতা কুরবান হোক আপনার কি হয়েছে? তিনি (সা.) বললেন, এইমাত্র জিবরীল (আঃ) এসে আমাকে বলে গেলেন যে, অদূর ভবিষ্যতে আমার উম্মতেরা আমার এ পুত্রটিকে হত্যা করবে। নবী (সা.) বলেন, আমি বিস্ময় প্রকাশে জিবরীল-কে জিজ্ঞেস করলাম, আমার এ পুত্রটিকে কি তারা হত্যা করবে? জিবরীল (আঃ) বললেন, হ্যাঁ এবং ঐ স্থানের লাল মাটি এনেও আমাকে দেখিয়েছেন, যেখানে তাঁকে হত্যা করা হবে।
[সহিহ: বায়হাকী ৬/৪৬৯, সিলসিলাতুস সহীহাহ ৮২১, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম ৪৮১৮। মেশকাত (এমদাদিয়া) ৫৯২০।]
★
সালমা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) -এর কাছে গিয়ে দেখলাম, তিনি কাঁদছেন। প্রশ্ন করলাম, আপনি কেন কাঁদছেন? তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে এমন অবস্থায় দেখেছি, অর্থাৎ স্বপ্নে তাঁর মাথা ও দাড়ি ধুলাবালিতে মিশ্রিত। অতঃপর আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! এ অবস্থা কেন, কি হয়েছে আপনার? তিনি (সা.) বললেন, এইমাত্র হুসায়ন-এর শাহাদাতের স্থানে উপস্থিত হয়েছিলাম।
[তিরমিযী ৩৭৭১, আল মু'জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১৯৩২৫, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম ৬৭৬৪; হিদায়াতুর রুওয়াত ৫/৪৫৬, মেশকাত (এমদাদিয়া) ৫৯০৬।]
★
সালমা (আল-বাকরিয়া) (রহঃ) বলেন, আমি উম্মু সালামা (রাঃ)-এর নিকট গিয়েছিলাম, তখন তিনি কাঁদছিলেন। আমি বললাম, কিসে আপনাকে কাঁদাচ্ছে? তিনি বললেন, আমি স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি যে, তার মাথায় ও দাড়িতে ধুলা জড়িয়ে আছে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কি হয়েছে? তিনি বললেনঃ আমি এইমাত্র হুসাইনের নিহত হওয়ার জায়গায় হাযির হয়েছি।
[মেশকাত (এমদাদিয়া) ৫৯০৬, তিরমিজি (বা ই সে) ৩৭১০।]
★
৬৯৯৭. বুখারী (তাওহীদ)
আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, যে আমাকে স্বপ্ন দেখে সে প্রকৃতই দেখে। কারণ শয়তান আমার আকৃতি ধরতে পারে না।
(আধুনিক প্রকাশনী- ৬৫১৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৫২৬)
★উম্মুল মুমিনিন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেন যে একদা এক সময় দুই শাহাজাদা ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন খেলা করছিলেন। উক্ত সময় জিব্রাইল বার্তাবাহক এসে হুজুর রাসুলে পাক (সাঃ)-এর খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করলো যে আপনার পরে আপনার এই পুত্র শাহজাদা পাককে আপনার নামধারী উম্মতরা শহীদ করে দিবে। আর জিব্রাইল-এর ইশারা ছিল ইমাম হোসাইন-এর দিকে এবং হুজুর পাক (সাঃ)-এর খিদমতে কিছু মাটি হাজির করলো। হুজুর পাক (সাঃ) উক্ত মাটির ঘ্রাণ নিলেন এবং বললেন যে তার থেকে ব্যথা-বেদনা, বালা-মুসিবত-এর কঠিন ঘ্রাণ বের হচ্ছে। উক্ত মাটিকে নবী (সাঃ) উম্মে সালমা-কে প্রদান করে বললেন যে, হে উম্মে সালমা! তোমার কাছে এই মাটি রাখো। হুজুর (সাঃ) জানতেন যে মাটিবাহক ঐ সময় পর্যন্ত হায়াতে থাকবেন (ইলমে গায়েব)। তুমি যখন দেখবে যে, এই মাটি আর মাটি থাকবে না। যেদিন এই মাটি রক্তে পরিণত হয়ে যাবে, তুমি বুঝে নিবে যে আমার এই পুত্র শহীদ হয়ে গেছে। অতঃপর উম্মে সালমা (রাঃ) উক্ত তবারুক মাটি একটি শিশির মধ্যে ভরে রেখে দিলেন। এবং উক্ত মাটিকে সকল সময় প্রত্যহ দেখতেন আর মাটির সামনে এসে বলতেন যে, হে পবিত্র মাটি! যেদিন তুমি আর মাটি থাকবে না, তুমি তাজা "রক্তে" পরিণত হয়ে যাবে, ঐ দিন আজিম কোরবানি হবে যবহে আজিম হবে।
[(১) খাসায়েসুল কুবরা ২য় খণ্ড পৃষ্ঠা নং- ১২৫, (২) সিরুস্ শাহাদাতাইন- ২৮ পৃষ্ঠা, (৩) ইমাম তাবারানী এর মু'জামুল কাবির- ৩য় খণ্ড ১০৮ পৃষ্ঠা।]
★
রাসুল (সাঃ) বলেছেনঃ
নিশ্চয়ই প্রত্যেক মু'মিনের হৃদয়ে হোসাইনের শাহাদতের ব্যাপারে এমন ভালবাসা আছে যে, তার উত্তাপ কখনো প্রশমিত হয় না।
(মুস্তাদরাক আল-ওয়াসাইল, খণ্ড-১০, পৃষ্ঠা-৩১৮)
★ ১৫৯১। ইবনে মাজা
ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আবদুল আশহাল গোত্রের মহিলাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তারা উহুদ যুদ্ধে তাদের শহীদ আত্মীয়দের জন্য কান্নারত ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কিন্তু হামযা! তার জন্য কান্নাকাটি করার কেউ নেই?
(হাদিসটি ইমাম ইবনু মাজাহ এককভাবে বর্ণনা করেছেন। তাহকীক আলবানীঃ হাসান সহীহ।)
★ ১৮৪৮। নাসাঈ (ইঃ ফাঃ)
আমর ইবনু ইয়াযীদ (রহঃ) ... জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে তার পিতা উহুদের জিহাদের দিনে শহীদ হয়ে গিয়েছিলেন, আমি তার মুখমন্ডল থেকে কাপড় সরিয়ে ফেললাম এবং ক্রন্দন করছিলাম আর লোকেরা আমাকে বারণ করছিল। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বারণ করছিলেন না, আমার ফুফুও তাঁর জন্য ক্রন্দন করছিলেন।
★ ১৮৪৭। নাসাঈ (ইঃ ফাঃ)
ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) ... আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, ফাতিমা (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তিকালে এরূপ ক্রন্দন করেছিলেন এবং বলেছিলেনঃ হে আমার পিতা! কোন বস্তু তাকে তার পরওয়ারদিগারের অতি নিকটবর্তী করেছে? হে আমার পিতা! আমরা জিবরীল (আলাইহিস সালাম) এর নিকট তার মৃত্যূ শোক প্রকাশ করছি। হে আমার পিতা!
[সহীহ। ইবন মাজাহ ১৬৩০]
প্রকৃত ইসলামের স্বার্থে, ইমাম হোসাইনের স্মরণ ও শোক সকল মুমিনের মনে অপ্রতিরোধ্য হোক! ইয়াজিদ ও তার অনুসারীদের উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক!
No comments:
Post a Comment