বহুল প্রচলিত কয়েকটি জাল হাদিস।
********************************
হাদিস নং : এক
"আমার সাহাবীগণ নক্ষত্রতুল্য" অথবা "আমার সাহাবীগণ নক্ষত্রের ন্যায়, তোমরা তাদের যে কোনো একজনের অনুসরণ করলে সঠিক পথপ্রাপ্ত হবে।"
মুসলিম সমাজে প্রচলিত একটি জাল হাদীস: “আমার সাহাবীগণ নক্ষত্রতুল্য, তাঁদের যে কাউকে অনুসরণ করলেই তোমরা সুপথ প্রাপ্ত হবে।”
হাদিসটি আমাদের মধ্যে এত প্রসিদ্ধ যে, সাধারণ একজন মুসলিম স্বভাবতই চিন্তা করেন যে, হাদীসটি বুখারী, মুসলিমসহ সিহাহ সিত্তা ও সকল হাদীসগ্রন্থেই সংকলিত।
অথচ প্রকৃত বিষয় হলো, সিহাহ সিত্তাহ তো দূরের কথা অন্য কোনো প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থে এ হাদীসটি নেই। যয়ীফ ও জালিয়াত রাবীগণের জীবনীগ্রন্থে, কয়েকটি ফিকহ গ্রন্থে ও অপ্রসিদ্ধ দুই একটি হাদীসের গ্রন্থে এই বাক্যটি এবং এ অর্থের একাধিক বাক্য একাধিক সনদে বর্ণিত হয়েছে।
প্রত্যেক সনদেরই একাধিক রাবী জালিয়াত হিসেবে প্রসিদ্ধ অথবা অত্যন্ত দুর্বল ও মিথ্যা বলায় অভিযুক্ত। এজন্য আবূ বাকর বাযযার আহমদ ইবনু আমর(২৯২ হি), ইবনু হাযম জাহিরী আলী ইবনু আহমদ(৪৫৬ হি), যাহাবী মুহাম্মাদ ইবনু আহমদ(৭৪৮ হি) ও অন্যান্য মুহাদ্দিস এই হাদীসটিকে জাল ও ভিত্তিহীন বলে গণ্য করেছেন।
[ সুত্রঃ ১) আবদ ইবনু হুমাইদ, আল মুসনাদ, পৃ. ২৫০; ২) ইবনু হাযম, আল ইহকাম ৬/২৪৪; ৩) যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ২/১৪১-১৪২; ৪) সাখাবী, আল মাকাসিদ, পৃ. ৪৯-৫০; ৫) ইবনু হাজার, লিসানুল মীযান ২/১৩৭; ৬) হাদিসের নামে জালিয়াতি: প্রচলিত মিথ্যা হাদিস ও ভিত্তিহীন কথা (ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর), পৃষ্ঠা ৩০৯।]
ইবনু আব্দিল বার বলেনঃ
‘এ সনদটি দ্বারা দলীল সাব্যস্ত হয় না, কারণ এ সনদের বর্ণনাকারী হারিস ইবনু গোসাইন মাজহূল ।’
ইবনু হায্ম বলেনঃ
এ বর্ণনাটি নিম্ন পর্যায়ের।
আর সালাম ইবনু সুলাইম কতিপয় জাল হাদীস বর্ণনা করেছেন। এটি নিঃসন্দেহে সেগুলোর একটি।
আমি (আলবানী) বলছিঃ সালাম ইবনু সুলাইমকে বলা হয় ইবনু সুলায়মান আত-তাবীল, তার দুর্বলতার ব্যাপারে সকলে একমত। এমনকি তার সম্পর্কে ইবনু খাররাশ বলেনঃ তিনি মিথ্যুক। হাদীসটি জাল হওয়ার জন্য সালামই যথেষ্ট।
ইবনু হিব্বান বলেনঃ তিনি কতিপয় জাল হাদীস বর্ণনা করেছেন।
[ সুত্রঃ ১) রিজাল শাস্ত্র ও জাল হাদিসের ইতিবৃত্ত (ড. মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন), ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ২৪৯; ২) নাসিরুদ্দিন আলবানী কর্তৃক সংকলিত 'জাল জয়িফ হাদিস সিরিজ', হাদিস নং ৫৮। হাদিসের মান: জাল হাদিস; ৩) যঈফ ও মওজু হাদিসের সংকলন, (সংকলন- মুহাম্মদ আবদুল আযীয), পৃষ্ঠা ২৫৬/২৫৭ ]
হাদিস নং : দুই
"অবশ্যই আমার সাথীগণ নক্ষত্রতুল্য। অতএব তোমরা তাদের যে কারো কথা গ্রহণ করলে সঠিক পথপ্রাপ্ত হবে।"
হাদীসটি জাল।
হাদীসটি ইবনু আব্দিল বার মু’য়াল্লাক হিসাবে (২/৯০) বর্ণনা করেছেন এবং তার থেকে ইবনু হাযম মারফূ’ হিসাবে আবূ শিহাব হান্নাত সূত্রে হামযা যাযারী হতে ... বর্ণনা করেছেন।
অতঃপর ইবনু আব্দিল বার বলেছেনঃ ‘এ সনদটি সহীহ নয়, হাদীসটি নাফে‘ হতে এমন কেউ বর্ণনা করেননি যার দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যায়।’
আমি (আলবানী) বলছিঃ এ হামযা হচ্ছে আবূ হামযার ছেলে; দারাকুতনী তার সম্পর্কে বলেনঃ তিনি মাতরূক।
ইবনু আদী বলেনঃ তার অধিকাংশ বর্ণনা জাল (বানোয়াট)।
ইবনু হিব্বান বলেনঃ ‘তিনি নির্ভরযোগ্যদের উদ্ধৃতিতে এককভাবে জাল (বানোয়াট) হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি যেন তা ইচ্ছাকৃতই করেছেন। সুতরাং তার থেকে হাদীস বর্ণনা করাই হালাল নয়।
যাহাবী “আল-মীযান” গ্রন্থে তার জাল হাদীসগুলো উল্লেখ করেছেন। সেগুলোর একটি হচ্ছে এটি।
ইবনু হাযম “আল-মুহাল্লা” গ্রন্থে (৬/৮৩) বলেনঃ এটিই স্পষ্ট হয়েছে যে, এ বর্ণনাটি আসলে সাব্যস্ত হয়নি। বরং বর্ণনাটি যে মিথ্যা তাতে কোন সন্দেহ নেই।
কারণ আল্লাহ তাঁর নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর গুণাগুণ বর্ণনা করে বলেছেনঃ “আর তিনি মনোবৃত্তি হতে কিছু বলেন না। তাঁর উক্তি অহী ছাড়া আর অন্য কিছু নয়।” (সূরা নাজম: আয়াত ৩-৪)
যখন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সকল কথা শরীয়তের মধ্যে সত্য এবং তা গ্রহণ করা ওয়াজিব, তখন তিনি যা বলেন তা নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট হতেই আসে। আর আল্লাহর নিকট হতে যা আসে তাতে মতভেদ থাকতে পারে না, তাঁর এ বাণীর কারণে।
কোরআন:
“আর যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট হতে হতো, তাহলে তারা তাতে বহু মতভেদ পেত।” (সূরা নিসা: আয়াত ৮২)
আল্লাহ্ তা’আলা মতভেদ ও দ্বন্দ্ব করতে নিষেধ করেছেন, তাঁর এ বাণী দ্বারা:
“আর তোমরা আপোষে বিবাদ করো না।” (আনফালঃ আয়াত ৪৬)
অতএব এটি অসম্ভবমূলক কথা যে রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সাহাবীগণের প্রত্যেকটি কথার অনুসরণ করার নির্দেশ দিবেন, অথচ তাদের মধ্য হতে কেউ কোন বস্তুকে হালাল বলেছেন, আবার অন্যজন সেটিকে হারাম বলেছেন।
ইবনু হাযম এ বিষয়ে বলেছেনঃ সাহাবীগণের মধ্য হতে এমন মতামতও আছে যে, রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবদ্দশায় তারা তাতে ভুল করেছেন, সুন্নাত বিরোধী হওয়ার কারণে। অতঃপর (৬/৮৬) বলেছেনঃ কিভাবে সম্ভব তাদের অন্ধ অনুসরণ করা, যারা ভুল করেছেন, আবার সঠিকও করেছেন?
ইবনু হাযম মতভেদ নিন্দনীয় অধ্যায়ে (৫/৬৪) আরো বলেনঃ
আমাদের উপর ফরয হচ্ছে আল্লাহর নিকট হতে কুরআনের মধ্যে যা এসেছে ইসলাম ধর্মের শরীয়াত হিসাবে তার অনুসরণ করা এবং নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে সহীহ বর্ণনায় যা এসেছে তার অনুসরণ করা। কারণ সেগুলোও আল্লাহর নির্দেশ হিসাবে তাঁর নিকট ধর্মের ব্যাখ্যায় এসেছে।
অতএব মতভেদ কখনও রহমত হতে পারে না। আবার তা গ্রহণীয় হতে পারে না।
মোটকথা হাদীসটি মিথ্যা, বানোয়াট, বাতিল, যেমন ইবনু হাযম বলেছেন।
[ সুত্রঃ নাসিরুদ্দিন আলবানী কর্তৃক সংকলিত 'জাল জয়িফ হাদিস সিরিজ', হাদিস নং ৬১। হাদিসের মান: জাল হাদিস]
হাদিস নং : তিন
"আমার সাহাবীগণের বা আমার উম্মতের মতভেদ রহমত"
একটি অতি প্রচলিত হাদীসঃ “আমার উম্মতের ইখতিলাফ(মতভেদ) রহমত বা করুণা স্বরূপ।”
কখনো কখনো বলা হয়ঃ “আলেমদের এখতেলাফ বা মতবিরোধ রহমত।”
এবং কেউ বলেন, “আমার সাহাবীগণের এখতেলাফ রহমত।”
মুহাদ্দিসগণ ঘোষণা করছেন যে, এই বাক্যটি রহমত হিসেবে সমাজে বহুমুখে প্রচলিত হলেও কোনো হাদীসের গ্রন্থে এই হাদীসটি সনদসহ পাওয়া যায় না। কোনো সহীহ, যয়ীফ এমনকি জাল সনদেও তা বর্ণিত হয় নি।
সনদবিহীনভাবে অনেকেই বিভিন্ন গ্রন্থে এই বাক্যটি হাদীস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আল্লামা সুবকী বলেছেনঃ “মুহাদ্দিসগণের নিকট এটি হাদীস বলে পরিচিত নয়। আমি এই হাদীসের কোনো সনদই পাই নি, সহীহ, যয়ীফ বা বানোয়াট কোনো রকম সনদই এই হাদীসের নেই।”
[ সুত্রঃ ১) মোল্লা কারী, আল আসরার, ৫১পৃষ্ঠা; ২) সুয়ূতী, আল-জামি আস সগীর ১/১৩; ৩) আলবানী, যায়ীফাহ ১/১৪১; ৪) হাদিসের নামে জালিয়াতি: প্রচলিত মিথ্যা হাদিস ও ভিত্তিহীন কথা (ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর), পৃষ্ঠা ৩০৯।]
শাইখ জাকারিয়া আল-আনসারী “তাফসীর বায়যাবী” গ্রন্থের টীকাতে (কাফ ২/৯২) সুবকীর কথাটি সমর্থন করেছেন।
এছাড়া হাদীসটির অর্থও বিচক্ষণ আলেমদের নিকট অপছন্দনীয়। ইবনু হায্ম “আল-ইহকাম ফি উসূলিল আহকাম” গ্রন্থে (৫/৬৪) এটি কোন হাদীস নয় এ ইঙ্গিত দেয়ার পর বলেনঃ
এটি অত্যন্ত নিকৃষ্ট কথা। কারণ যদি মতভেদ রহমত স্বরূপ হত, তাহলে মতৈক্য অপছন্দনীয় হত। এটি এমন একটি কথা যা কোন মুসলিম ব্যক্তি বলেন না।
তিনি অন্য এক স্থানে বলেনঃ এটি বাতিল, মিথ্যারোপ।
আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
“যদি (এ কুর’আন) আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট হতে আসতো, তাহলে তারা তাতে বহু মতভেদ পেত।”
[সূরা নিসাঃ আয়াত ৮২]
আয়াতটি স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে, মতভেদ আল্লাহ তা’আলার নিকট হতে নয়। অতএব কীভাবে এ মতভেদকে অনুসরণীয় শরীয়াত বানিয়ে নেয়া সঠিক হয়? আর কীভাবেই তা নাযিলকৃত রহমত হতে পারে?
মোট কথা শরীয়াতের মধ্যে মতভেদ নিন্দনীয়। কারণ এটি হচ্ছে উম্মাতের দুর্বলতার কারণসমূহের একটি।
যেমনিভাবে আল্লাহপাক বলেছেনঃ
“আর আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ মান্য কর এবং তাঁর রসূলের। তাছাড়া তোমরা পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হইও না। যদি তা কর, তবে তোমরা কাপুরুষ হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য্যধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা রয়েছেন ধৈর্য্যশীলদের সাথে।" [আনফালঃ আয়াত ৪৬]
অতএব মতভেদে সন্তুষ্ট থাকা এবং রহমত হিসেবে তার নামকরণ করা সম্পূর্ণ আয়াত বিরোধী কথা, যার অর্থ খুবই স্পষ্ট। অপরপক্ষে মতভেদের সমর্থনে সনদবিহীন [রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে যার কোন ভিত্তি নেই] এ জাল হাদীস ছাড়া আর কোন প্রমাণ নেই।
[ সুত্রঃ নাসিরুদ্দিন আলবানী কর্তৃক সংকলিত 'জাল জয়িফ হাদিস সিরিজ', হাদিস নং ৫৭। হাদিসের মান: জাল হাদিস।]
হাদিস নং ; চার
"আমার উম্মতের আলিমগণ বণী ইসরাঈলের নবীগণের মত।"
হাদিসটি জাল।
কথিত-আলিম ও ধার্মিকগণের মধ্যে বহুল প্রচলিত একটি বাক্য। “আমার উম্মতের আলিমগণ বণী ইসরাঈলের নবীগণের মত”।
মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এই বাক্যটি নবীজী(সা) এর কথা নয়। বরং তাঁর নামে প্রচলিত একটি ভিত্তিহীন, সনদহীন মিথ্যা, জাল ও বানোয়াট কথা।
[ সুত্রঃ ১) সাখাবী, আল মাকাদিস, ২৯৩ পৃষ্ঠা; ২) মোল্লা কারী, আল আসরার, ১৫৯ পৃষ্ঠা]
অনেক ওয়ায়িয এ মিথ্যা হাদীসকে কেন্দ্র করে জাল গল্প বলেন যে, হযরত মূসা(আ) এর সাথে নাকি রাসূল মুহাম্মাদ(সা)-এর এ নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল! নাউজুবিল্লাহ! কি জঘন্য বানোয়াট কথা!!
[ সুত্রঃ ১)হাদিসের নামে জালিয়াতি: প্রচলিত মিথ্যা হাদিস ও ভিত্তিহীন কথা (ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর), পৃষ্ঠা ৩৩৭; ২) সাখাবী, আল-মাকাসিদ, পৃষ্ঠা ২৯৩; ৩) মোল্লা কারী, আল-আসরার, পৃষ্ঠা ১৫৯; ৪) যারকানী, মুখতাসারুল মাকাসিদ, পৃষ্ঠা ৬৫২।]
No comments:
Post a Comment